বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যে কয়জন মুসলিম কবি পথিকৃত হিসেবে স্বীকৃত, তাদের মধ্যে মহাকবি কায়কোবাদের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়। তাঁর প্রকৃত নাম মুহম্মদ কাজেম আল কোরেশী (১৮৫৭–১৯৫১)। সাহিত্যের অঙ্গনে তিনি কেবল একজন কবিই নন, বরং ছিলেন অগ্রদূত—প্রথম মুসলিম কবি যিনি বাংলা ভাষায় সনেট রচনা করেন। তবে তাঁর খ্যাতির মূল স্তম্ভ হলো মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’, যা তাঁকে বাংলা কাব্যসাহিত্যের মহাকবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কায়কোবাদের সাহিত্যজীবন যেমন মহিমান্বিত, তেমনি তাঁর জীবিকার গল্পও কম বিস্ময়কর নয়। ব্রিটিশ আমলে তিনি কর্মসূত্রে যোগ দেন ডাক বিভাগের সঙ্গে। দায়িত্ব পান জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা পোস্ট অফিসের (পোস্ট কোড ২০৫৪) পোস্টমাস্টার পদে। তখনকার দিনে পিংনা ছিল এক ব্যস্ত নদীবন্দর, পাটের হাট আর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এখানেই প্রায় এক দশক ধরে কায়কোবাদ কাটিয়েছেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়।
পিংনা পোস্ট অফিসের সেই ছোট্ট ঘরে, হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে দিনভর অফিসের কাজ সারতেন তিনি। কিন্তু রাতে, যখন গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে যেত, তখন হারিকেনের আলোয় তাঁর সামনে খুলে যেত এক মোটা খাতা। কলমের নিব ছুঁয়ে যেত সাদা পাতায়, আর জন্ম নিত বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য মহাকাব্য। ১৮৯৫ থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় দশ বছর তিনি লিখেছেন ‘মহাশ্মশান’। তিন খণ্ডে ৬০টি সর্গ আর প্রায় ৯০০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থ ধনবাড়ীর নবাব নওয়াব আলীর অর্থানুকূল্যে ১৯০৪ সালে প্রকাশিত হয়।
মহাশ্মশান প্রকাশিত হওয়ার আগে ১৮৯৮ সালে ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় এর কিছু অংশ ছাপা হয়েছিল। তখনই পাঠকমহলে আলোড়ন ওঠে। পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে এটি প্রকাশিত হলে বাংলা কাব্যসাহিত্যে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। কায়কোবাদ শুধু কবিতাই লিখেননি, তিনি প্রমাণ করেছিলেন—বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবিদের অবদানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য।
আজকের দিনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেই ঐতিহাসিক পোস্ট অফিস আর নেই। কয়েক মাস আগে পুরনো দালান ভেঙে সেখানে তৈরি করা হয়েছে আধুনিক ডিজিটাল ডাকঘর। সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তন অবশ্যই স্বাভাবিক, তবে দুঃখজনক বিষয় হলো—যেখানে বসে কায়কোবাদ মহাকাব্য লিখেছিলেন, সেই স্থানে তাঁর কোনো স্মৃতিচিহ্ন আজ সংরক্ষিত নেই। নেই কোনো ফলক, নেই কোনো চিহ্ন, যা নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেবে পিংনার সঙ্গে এক মহাকবির অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র।
তবু ইতিহাস মুছে যায় না। পিংনা পোস্ট অফিস শুধু একটি ডাকঘর নয়, এটি আসলে বাংলা সাহিত্যের এক নিঃশব্দ সাক্ষী। ডাকঘরের নাম শুনলেই মনে পড়ে যায়—হারিকেনের আলোয় এক পোস্টমাস্টার কবি লিখে চলেছেন মহাকাব্য।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজনে এ ধরনের স্থানগুলোতে ন্যূনতম স্মৃতিচিহ্ন রাখা জরুরি। কারণ এগুলো শুধু ইতিহাস নয়, এগুলো আমাদের জাতির গর্ব। পিংনা পোস্ট অফিস সেই গৌরবময় ইতিহাসের অংশ, যেখান থেকে জন্ম নিয়েছে বাংলা সাহিত্যের এক মহাকাব্য।
মহাকবি কায়কোবাদের কবিতার মতোই তাঁর পোস্ট অফিসের গল্পও চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে বাঙালির স্মৃতিপটে।